নিজস্ব প্রতিবেদক:
ফোরামের দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কাউন্সিল উপলক্ষে নারী সমাবেশ ও কমিটি পরিচিতি সভা
সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কাউন্সিল উপলক্ষে আজ ৭ জানুয়ারি ২০২২ বিকাল ৩ টায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে নারী সমাবেশ ও কমিটি পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের পূর্বে বিশ^বিদ্যালয় চত্বরে র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রওশন আরা রুশো, পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শম্পা বসু। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দিলরুবা নূরী, চা শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা ও মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ৪ নং মুন্সীবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসনের নবনির্বাচিত সদস্য চা শ্রমিক কাজল রায়, মহিলা ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডাক্তার মনীষা চক্রবর্ত্তী ও রুখশানা আফরোজ আশা।
সভাপতির বক্তব্যে রওশন আরা রুশো বলেন, নারী মুক্তির সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পুঁজিবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থা। ধর্ষণ, বিচারহীনতা, মৌলবাদ, ভোগবাদ, পুরুষতন্ত্র-এসবই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনুষঙ্গ। পুঁজিবাদ সবকিছুকেই পণ্যে পরিণত করে, মানুষের অধিকার, হৃদয়বৃত্তি, সেবা কোন কিছুই বাদ পড়ে না মুনাফার চোখে। পুঁজিবাদের কাছে নারীও পণ্য। তাই প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে সরকারি হিসাব মতেই প্রায় ২০ হাজার নারী পাচার করে বিভিন্ন দেশের পতিতালয়, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনোতে বিক্রি করা হয়। নারী দেহকে পণ্য বানিয়ে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার পর্নোগ্রাফি ও ব্লুফিল্ম বিক্রি করা হয় আর সাথে চলে মাদক ব্যবসা। তিনি আরও বলেন, নারী মুক্তি আন্দোলন কোন সমাজবিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। পুরুষদের বিরুদ্ধে নারীদের লড়াই নয়। নারীর অধিকার ও মর্যাদা সমাজের সকল মানুষের অধিকার ও মর্যাদার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী চলছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের ঘোষণা দিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। বিগত ৫০ বছরে যারাই দেশ পরিচালনা করেছে তারাই এই ঘোষণার বিপরীতে হেঁটেছে। যার ফলে সাম্যের পরিবর্তে বৈষম্য বেড়েছে। এর নির্মম শিকার নারী পুরুষ উভয়ই। পুঁজিবাদী সমাজে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে নানাদিক দিয়ে আরও উৎসাহিত ও শক্তিশালী করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নারীরাও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করেছে অথচ তার কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নাই। সমাজে নারীরা দ্বৈত শোষণের শিকার হচ্ছে। মানবিক মর্যাদা ধুলিস্যাৎ হয়েছে একের পর এক নিপীড়ন নির্যাতনের ঘটনায়। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো স্বাধীন দেশের সংবিধানে নারীকে আইনত বানিয়ে দিয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। অথচ আমরা জানি সভ্যতা মানে মানব সভ্যতা, পুরুষ বা নারী সভ্যতা নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কখনোই মানুষের মুক্তি দিতে পারে না , সার্বিকভাবে নারীমুক্তিও এখানে সম্ভব নয়। শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সমাজ পরিবর্তনের লড়াই প্রয়োজন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তে শোষণহীন সাম্য সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের লড়াই জোরদার করতে হবে। ফলে নারী মুক্তির আন্দোলনকেও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপান্তর করার সংগ্রাম মহিলা ফোরামকে জারি রাখতে হবে।
প্রকৌশলী শম্পা বসু বলেন, দেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে নারী নির্যাতন হয় না। ঘরে বাইরে, পাহাড়ে, সমতলে, গণপরিবহনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে, থানা হাজতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এমনকি শহীদ মিনারেও নারীরা ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন। গত বছর বাংলাদেশ বাল্যবিবাহের হারের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম ও বিশে^র মধ্যে চতুর্থ হয়েছে। গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ ও পোশাক কারখানায় ৮০ শতাংশ নারী মৌখিক, দৈহিক বা যেকোন ধরনের যৌন নিপীড়নের শিকার হন। এছাড়া পরিবারে নারীর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমেরও কোন মূল্য নেই বললেই চলে। রাষ্ট্রও নারীর গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য জিডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করেনা। এ্যাডভোকেট দিলরুবা নূরী বলেন, যতদিন পর্যন্ত সমাজে ধনী গরীব বৈষম্য থাকবে, শ্রেণি শোষণ বজায় থাকবে ততদিন পর্যন্ত নারীর উপর পুরুষতান্ত্রিক শোষণের অবসান ঘটবে না। তাই সমাজের আমূল পরিবর্তনের বিপ্লবী লড়াইয়ের পথে সার্বিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সকলকে সেই লড়াইয়ে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশ শেষে ২য় কাউন্সিল এর মধ্য দিয়ে গঠিত তৃতীয় কমিটি পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। প্রকৌশলী শম্পা বসুকে সভাপতি, অ্যাডভোকেট দিলরুবা নূরীকে সাধারণ সম্পাদক ও ডাক্তার মনীষা চক্রবর্ত্তীকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।
Leave a Reply